সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩৪ অপরাহ্ন
মুফতি উবায়দুল হক খান:
মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিয়ে। এটি কেবল সামাজিক চুক্তি নয়; বরং ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি পবিত্র ইবাদত, যা মানুষের চরিত্র গঠন, নৈতিকতা সংরক্ষণ এবং সমাজকে সুস্থ রাখার অন্যতম মাধ্যম। তাই ইসলামে বিয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইসলামে বিয়ের উপযুক্ত বয়স কত? এ বিষয়ে কোরআন ও হাদিসের আলোকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
বিয়ের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব : প্রথমেই বুঝতে হবে, ইসলাম বিয়েকে কেন গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেন, ‘আর তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই তোমাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও। তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে সেই কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।’ (সুরা রুম ২১)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, বিয়ের উদ্দেশ্য হলো মানসিক শান্তি, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া বিয়ে মানুষের চরিত্রকে পবিত্র রাখে এবং সমাজে অবৈধ সম্পর্ক প্রতিরোধ করে।
কোরআনের আলোকে বিয়ের উপযুক্ত বয়স : কোরআনে সরাসরি বিয়ের কোনো নির্দিষ্ট বয়স উল্লেখ করা হয়নি। তবে কিছু নীতিমালা দেওয়া হয়েছে, যা থেকে বিয়ের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা এতিমদের পরীক্ষা করতে থাক, যতক্ষণ না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছে…।’ (সুরা নিসা ৬) এই আয়াতে ‘বিয়ের বয়সে পৌঁছানো’ বলতে শুধু শারীরিক পরিপক্বতা নয়, বরং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতাকেও বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি তখনই বিয়ের উপযুক্ত, যখন সে নিজের দায়িত্ব বুঝতে সক্ষম হয়।
হাদিসের আলোকে বিয়ের বয়স : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কারণ এটি দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) এখানে ‘সামর্থ্য’ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে শারীরিক সক্ষমতা, আর্থিক সামর্থ্য ও মানসিক প্রস্তুতি অন্তর্ভুক্ত। অতএব, শুধু বয়স নয়, বরং এই তিনটি বিষয় পূর্ণতা পাওয়াই বিয়ের জন্য প্রধান শর্ত।
বালেগ হওয়া ও পরিপক্বতা : ইসলামে সাধারণত বিয়ের প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে ‘বালেগ’ হওয়াকে বিবেচনা হয়। বালেগ হওয়া মানে শারীরিক পরিপক্বতা অর্জন করা। তবে ইসলাম শুধুমাত্র বালেগ হওয়াকেই যথেষ্ট মনে করে না। কারণ, একজন মানুষ বালেগ হলেও সে যদি দায়িত্বশীল না হয়, তাহলে সংসার পরিচালনা করা তার জন্য কঠিন হয়ে যায়। তাই ইসলামে বিয়ের জন্য প্রজ্ঞা ও পরিপক্বতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজ ও পরিবেশের প্রভাব : ইসলাম একটি বাস্তবমুখী ধর্ম। তাই বিয়ের বয়স নির্ধারণে সমাজ, সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রভাবও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এক সমাজে ১৮ বছর বয়সে একজন পরিপক্ব হতে পারে, আবার অন্য সমাজে ২৫ বছরেও সে প্রস্তুত নাও হতে পারে।
এ কারণে ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ না করে একটি নমনীয় নীতি দিয়েছে, যাতে সব সমাজে তা প্রযোজ্য থাকে।
দেরিতে বিয়ের ক্ষতি : বর্তমান সমাজে অনেকেই বিভিন্ন কারণে বিয়ে দেরিতে করে। এর ফলে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। যেমন অবৈধ সম্পর্কের ঝুঁকি বৃদ্ধি, মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক অবক্ষয়।
হজরত রাসুল (সা.) বিয়েকে সহজ করার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন এবং অযথা বিলম্ব করতে নিষেধ করেছেন। তাই ইসলামে অপ্রয়োজনীয় কারণে বিয়ে বিলম্ব করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
অল্প বয়সে বিয়ের ঝুঁকি : অতি অল্প বয়সে বিয়েও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন মানসিক অপরিপক্বতা, অর্থনৈতিক অক্ষমতা ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব।
ইসলাম যেহেতু দায়িত্বশীলতার ওপর জোর দেয়, তাই এমন বয়সে বিয়ে করা উচিত নয়, যখন কেউ নিজের দায়িত্বই বুঝতে পারে না।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে বিয়ের বয়স : বর্তমান সময়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় বিয়ের বয়স কিছুটা পিছিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার গঠনের জন্য সময় প্রয়োজন হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে এটি বৈধ, যদি ব্যক্তি নিজের চরিত্র সংরক্ষণ করতে পারে এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকে। তবে যদি কেউ নিজের ইমান ও চরিত্র রক্ষা করতে আশঙ্কা করে, তাহলে তার জন্য দ্রুত বিয়ে করাই উত্তম।
অভিভাবকদের দায়িত্ব : বিয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাদের উচিত, সন্তানদের মানসিক ও ধর্মীয়ভাবে প্রস্তুত করা, অযথা বিলম্ব না করা, পাত্র-পাত্রীর চরিত্র ও দ্বীনদারিতা যাচাই করা। হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি তোমাদের কাছে এমন কোনো ব্যক্তি আসে, যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তবে তাকে বিয়ে দাও…।’ (সুনানে তিরমিজি)
ইসলামে বিয়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। বরং কিছু মৌলিক শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। শারীরিক পরিপক্বতা, মানসিক প্রস্তুতি ও আর্থিক সামর্থ্য এই তিনটি বিষয় পূর্ণতা পেলেই একজন ব্যক্তি বিয়ের জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে।
অতএব, ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ের উপযুক্ত বয়স কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং যখন একজন মানুষ দায়িত্বশীল, পরিপক্ব এবং সংসার পরিচালনায় সক্ষম হয়, তখনই সে বিয়ের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। তাই আমাদের উচিত, কোরআন ও হাদিসের আলোকে বাস্তবতা বিবেচনা করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সমাজে একটি সুস্থ ও পবিত্র পরিবেশ গড়ে তোলা।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া গাজীপুর
ভয়েস/আআ/সূত্র”দেশরূপান্তর